পদ্মিনী কোলহাপুরে। এক্স থেকে
ভারতের হিন্দি চলচ্চিত্রের আশির দশকের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ পদ্মিনী কোলহাপুরের আজ ১ নভেম্বর জন্মদিন। ১৯৬৫ সালের ১ নভেম্বর মহারাষ্ট্রের এক সাঙ্গীতিক পরিবারে জন্ম নেন তিনি। তাঁর পিতা পণ্ডিত পণ্ডরীনাথ কোলহাপুরে ছিলেন বিশিষ্ট সুরসাধক। কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোসলে সম্পর্কে তাঁর আত্মীয়। তিন বোনের মধ্যে মেজ পদ্মিনী শৈশবে গায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন এবং দুই প্রখ্যাত পিসির দলের সঙ্গে কোরাসেও অংশ নেন; এমনকি নিজের কয়েকটি চলচ্চিত্রে কণ্ঠদানও করেন। তবে ভাগ্য তাঁকে টেনে নিয়ে যায় রূপালি পর্দায়। তাঁর বড় বোন শিবাঙ্গী কোলহাপুরের স্বামী অভিনেতা শক্তি কাপুর এবং তাঁদের মেয়ে অভিনেত্রী শ্রদ্ধা কাপুর; কনিষ্ঠ বোন তেজস্বিনীও অভিনয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মাত্র সাত বছর বয়সে ১৯৭২ সালে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের খাতায় নাম লেখান পদ্মিনী। ‘ইশক ইশক ইশক’, ‘জিন্দেগি’ ও ‘ড্রিম গার্ল’-এ ছোট চরিত্রে রূপদানের পর ১৯৭৮ সালে রাজ কাপুরের ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ চলচ্চিত্রে জিনাত আমান অভিনীত চরিত্র রূপার বাল্যকালের ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি প্রভূত খ্যাতি লাভ করেন।
এরপর ১৯৮০ সালে ‘ইনসাফ কা তারাজু’ সিনেমায় ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীর জটিল যন্ত্রণাদায়ক চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় উপহার দেন তিনি। এই অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে মাত্র ১৫ বছর বয়সে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতে তাক লাগিয়ে দেন। ১৯৮১ সালে ‘আহিস্তা আহিস্তা’ ছবিতে বিশেষ প্রশংসা কুড়োনোর পর ১৯৮২ সালে রাজ কাপুর নির্মিত ‘প্রেম রোগ’-এ ঋষি কাপুরের বিপরীতে উচ্চবর্ণের এক তরুণ বিধবার ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। কুসংস্কার ও সামাজিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে করা সেই বলিষ্ঠ অভিনয়ের সুবাদে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর খেতাব অর্জন করেন পদ্মিনী। পরবর্তী সময়ে ‘বিধাতা’, ‘ওহ সাত দিন’, ‘পেয়ার ঝুকতা নেহি’, ‘স্বর্গ সে সুন্দর’, ‘মুদ্দত’ ও ‘দাতা’র মতো অজস্র ব্যবসাসফল ছবি উপহার দেন তিনি। মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর রসায়ন বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
সাফল্যের পাশাপাশি কিছু হাতছাড়া হয়ে যাওয়া কাজের আক্ষেপও রয়েছে তাঁর ক্যারিয়ারে। ‘সিলসিলা’, ‘তোহফা’ ও ‘এক দুজে কে লিয়ে’র মতো ছবিগুলো ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাঁকে, যে চরিত্রগুলোতে পরবর্তী সময়ে যথাক্রমে রেখা, শ্রীদেবী ও রতি অগ্নিহোত্রী অভিনয় করেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় আক্ষেপ রাজ কাপুরের ‘রাম তেরি গঙ্গা মেইলি’। পর্দায় চুম্বনদৃশ্যে আপত্তি থাকায় তিনি মুখ্য চরিত্রটির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন, যা পরবর্তীতে মন্দাকিনীকে খ্যাতি এনে দেয়। পরিচালক মন্দাকিনীকে নিয়ে ৪৫ দিন চিত্রগ্রহণের পরও পদ্মিনীকে নেওয়ার কথা ভাবলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। পর্দার বাইরে ১৯৮১ সালে মুম্বাইয়ের রাজকমল স্টুডিওতে ‘আহিস্তা আহিস্তা’র সেটে ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লস (বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লস) উপস্থিত হলে তাঁকে স্বাগত জানাতে গিয়ে অভিনেত্রী শশীকলা আরতি করার পর পদ্মিনী সরল আনন্দ ও সৌজন্যবশত চার্লসের গালে একটি চুম্বন আঁকেন। সেই দৃশ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শোরগোল ফেলে দেয় এবং পদ্মিনীকে নিয়ে প্রবল বিতর্কের সৃষ্টি হয়, এমনকি তাঁর আইনজীবী চাচাকে নোটিশের জবাব দিতে হয়। ২০২২ সালে চার্লসের সিংহাসনে আরোহণের পরও এই স্মৃতি ফিরে আসে; যুক্তরাজ্যে একবার অভিবাসন কর্মকর্তাও পদ্মিনীর পরিচয় পেয়ে এই প্রসঙ্গ তোলেন।
ব্যক্তিজীবনে পর্দার সহশিল্পী ঋষি কাপুরের ঘোর ভক্ত ছিলেন পদ্মিনী; বাল্যকালে স্কুল ফাঁকি দিয়ে এবং মা-বাবাকে মিথ্যা বলেও ঋষির ছবি দেখতে যেতেন। পরে তাঁর সঙ্গেই ‘জামানে কো দিখানা হ্যায়’ ছবির ‘পুছো না ইয়ার ক্যায়া হুয়া’ গানের দৃশ্যে অভিনয়ের স্মৃতি তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। ২০২০ সালে ঋষি কাপুরের মৃত্যুতে তিনি গভীর শোকাহত হন। এদিকে তাঁর বাস্তব জীবনের প্রণয়কাহিনীও কোনো চিত্রনাট্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর ছিল না। ১৯৮৬ সালে ‘আইসা পেয়ার কাহাঁ’ ছবির শুটিং চলাকালে প্রযোজক প্রদীপ শর্মা ওরফে টুটু শর্মার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রেম গড়ে ওঠে। কিন্তু রক্ষণশীল মারাঠি পরিবারের আপত্তির মুখে পদ্মিনী নিজের ভালোবাসাকে ত্যাগ করেননি। বড় বোন শিবাঙ্গী, দুলাভাই শক্তি কাপুর এবং অন্তরঙ্গ বান্ধবী পুনম ধিল্লনের সহযোগিতায় বাড়ির পেছনের প্রাচীর টপকে পালিয়ে গিয়ে ১৯৮৬ সালে প্রদীপকে বিয়ে করেন তিনি। এরপর নবদম্পতি জয়পুরে পাড়ি জমান এবং ওই ছবির কিছু দৃশ্য পুনরায় ধারণ করতে হয়। পরবর্তীতে তাঁদের একমাত্র সন্তান প্রিয়াঙ্ক শর্মা ২০২১ সালে প্রযোজক করিম মোরানির কন্যা শাজা মোরানিকে বিয়ে করেন। দীর্ঘ দাম্পত্যে পদ্মিনী ও টুটু শর্মা আজও একসঙ্গেই রয়েছেন।
টানা অভিনয়ের ক্লান্তি এবং দাম্পত্য ও মাতৃত্বকে প্রাধান্য দিতে ১৯৮৯ সালের দিকে অভিনয়জীবন থেকে দীর্ঘ বিরতি নেন পদ্মিনী। দীর্ঘ ব্যবধানের পর ২০০৩ সালে ‘চিমানি পাখর’ নামক মারাঠি ছবির মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন করে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। পরবর্তীতে ‘মাই’, ‘দ্য ডটার’, ‘ফাটা পোস্টার নিকলা হিরো’ ও ২০১৯ সালের ‘পানিপথ’-এ তিনি কাজ করেন। ছোট পর্দায় ‘এক নায়ি পেহচান’ ধারাবাহিক, ওটিটিতে ‘দিল বেকারার’ এবং মঞ্চে ‘বাপ কা বাপ’ নাটকে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করে। ২০২৪ সালে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন যে পাঁচ দশকের পথচলায় থিয়েটার তাঁকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার নতুন স্বাদ দিয়েছে। প্রায় ১২ বছর পর ২০২৫ সালে ঐতিহাসিক মেগা ধারাবাহিক ‘চক্রবর্তী সম্রাট পৃথ্বীরাজ চৌহান’-এ রাজমাতার চরিত্রে ছোট পর্দায় প্রত্যাবর্তন ঘটে তাঁর। তবে সুবিশাল ক্যারিয়ারে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করতে না পারার খামতি আজও তাঁর মনে আক্ষেপ হয়ে রয়ে গেছে।
আপনার মতামত লিখুন