মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস
বিজ্ঞানী, ক্রীড়াবিদ, সাহিত্যিক কিংবা বিত্তবান উদ্যোক্তা—সফল ব্যক্তিদের জীবনধারা ভিন্ন হলেও তাঁদের শৈশবে গড়ে ওঠা কিছু সাধারণ অভ্যাস পরবর্তী জীবনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। নিয়মিত অধ্যয়ন, অনুসন্ধিৎসু মন, নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন আর প্রতিকূলতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার মতো অভ্যাসগুলো জীবনের শুরু থেকেই তৈরি করা সম্ভব। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা থেকে এমন ১০টি তাৎপর্যপূর্ণ অভ্যাসের চিত্র পাওয়া যায়।
১. ব্যাপক পড়াশোনা: বই পড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক বলেছিলেন, ‘পড়ার বাইরে আমার তিনটে উপদেশ আছে—পড়ো, পড়ো এবং পড়ো।’ নতুন তথ্য আবিষ্কার, কল্পনাশক্তির বিস্তার ও ভিন্নভাবে ভাবতে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের শৈশবে পড়াশোনার গভীর প্রভাব ছিল; একইভাবে বিল গেটসও অল্প বয়স থেকেই বিচিত্র বিষয়ে বই পড়তেন। সফল বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটও অবিরাম পাঠাভ্যাসের কথা গুরুত্ব দিয়ে বলেন। ইতিহাস, বিজ্ঞান, রূপকথা বা জীবনীপাঠ যেকোনো শিশুর চিন্তার পরিধিকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
২. জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধিৎসা: প্রচলিত ছড়ার চরণে রয়েছে—‘মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার, সবাই বলে মিথ্যে বাজে বকিস নে আর খবরদার।’ আকাশের নীল রং, পিঁপড়ার সুশৃঙ্খল চলন কিংবা চুম্বকের লোহা টানার মতো বিস্ময় থেকেই অনুসন্ধানের শুরু। পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ছোটবেলায় তাঁর বাবার উপহার দেওয়া একটি কম্পাসের কাঁটার নির্দিষ্ট দিকে নির্দেশ করার রহস্য দেখে গভীরভাবে চমকিত হয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে তাঁকে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে অনুপ্রাণিত করে। যেকোনো বড় আবিষ্কারের সূচনা হয় একটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়ে।
৩. নিয়মিত ও নিবিড় চর্চা: ‘প্র্যাকটিস মেকস আ ম্যান পারফেক্ট!’ যেকোনো দক্ষতায় পারদর্শিতা অর্জনের মূল চাবিকাঠি হলো অনুশীলন। তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শ্রেষ্ঠত্বের নেপথ্যে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলা কঠোর সাধনা। ক্রীড়াঙ্গন ছাড়াও বিজ্ঞানী, সংগীতশিল্পী কিংবা লেখকদের ক্ষেত্রেও এ নিয়ম সমভাবে প্রযোজ্য। কঠিন গণিত সমাধান, বাদ্যযন্ত্র বাজানো কিংবা লেখার চর্চায় তাৎক্ষণিক সাফল্য না এলেও ক্রমাগত পরিশ্রমে উন্নতি নিশ্চিত হয়।
৪. শৈশব থেকেই উদ্যোগী হওয়া: ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে!’ ছোটবেলাতেই দায়িত্বশীল হওয়া বা নিজে কিছু করার তাগিদ ভবিষ্যৎ জীবনের পথ তৈরি করে। বিশিষ্ট বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট বাল্যকালে চুইংগাম বিক্রি এবং পরবর্তীতে সংবাদপত্র বিতরণের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেছিলেন। বিদ্যালয়ের কোনো প্রকল্পে নেতৃত্ব দেওয়া, সমস্যার সমাধান করা বা নিজস্ব ভাবনা বাস্তবায়ন শিশুদের আত্মবিশ্বাস কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
৫. প্রতিকূলতা জয় ও ভুল থেকে শিক্ষা: কার্টুন চরিত্র মিকি মাউসের স্রষ্টা ওয়াল্ট ডিজনি বলেছিলেন, ‘আমাদের সব স্বপ্নই সত্যি হতে পারে, যদি সেগুলো পূরণ করার সাহস থাকে।’ ব্যর্থতা মানেই চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়, বরং তা ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। মেসি ও রোনালদো দুজনকেই শারীরিক সীমাবদ্ধতা, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠা পেতে হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে ব্যর্থতাকে শক্তিতে পরিণত করে নতুন পরিকল্পনায় এগিয়ে যেতে হয়।
৬. শারীরিক সচলতা ও সুস্থতা: ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন!’ শরীরকে কর্মক্ষম রাখতে নিয়মিত খেলাধুলা, হাঁটা এবং বয়সোপযোগী শরীরচর্চা অত্যন্ত জরুরি। কেবল ক্রীড়াবিদই নন, লেখক, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের জন্যও শারীরিক সুস্থতা অপরিহার্য। দীর্ঘ সময় পড়াশোনা বা কাজের ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা, মুক্ত বাতাসে হাঁটা ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া মানসিক সতেজতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৭. সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ: কাজী নজরুল ইসলামের অমর পঙ্ক্তি ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী’ সৃজনশীল সত্তার প্রকাশ ঘটায়। সংগীত, চিত্রাঙ্কন কিংবা লেখালেখি মানুষের চিন্তার পরিসরকে উন্মুক্ত করে দেয়। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন গবেষণার পাশাপাশি বেহালা বাজাতে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। নিজের পছন্দের সৃজনশীল কাজে নিখুঁত হওয়ার চেয়ে তার মধ্য দিয়ে সৃষ্টির আনন্দ উপলব্ধি করাই মূল বিষয়।
৮. নিজস্ব চিন্তাভাবনার বিকাশ: দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের মতে, ‘একটি বিচক্ষণ প্রশ্ন হলো প্রজ্ঞার অর্ধেক।’ অন্যের মত হুবহু গ্রহণ না করে সত্যতা যাচাই ও যুক্তির নিরিখে মূল্যায়ন করা উচিত। আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো গবেষকেরা প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে যুক্তিবোধ দিয়ে মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। ভিন্নমত শোনা, ভুল স্বীকার করা এবং যুক্তিনির্ভর চিন্তা স্বাধীন ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায়।
৯. সময়ের সদ্ব্যবহার ও ধারাবাহিকতা: প্রযুক্তি ব্যক্তিত্ব স্টিভ জবসের একটি প্রচলিত বক্তব্য অনুযায়ী, ‘সময় হলো মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।’ প্রতিটি মুহূর্ত কাজের মধ্যে কাটানো নয়, বরং বিনোদন ও বিশ্রামের পাশাপাশি কাজের সঠিক পরিকল্পনা থাকা জরুরি। প্রতিদিন অল্প অল্প করে ধারাবাহিকভাবে কাজ এগিয়ে নিয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদে বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়।
১০. লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকা: ‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, বিশ্বাস হৃদয়ে, হবেই হবেই দেখা, দেখা হবে বিজয়ে।’ ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ‘উইমেনস মার্চ’-এ অংশ নেওয়া লেখক ও নারীবাদী চিন্তাবিদ গ্লোরিয়া স্টাইনেম একবার বলেছিলেন, ‘স্বপ্ন দেখা তো আসলে একধরনের পরিকল্পনা।’ তাই কেবল স্বপ্ন দেখলেই চলবে না, ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করে তা পূরণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সাফল্য লাভের কোনো বাঁধাধরা নিয়ম না থাকলেও নিয়মিত অভ্যাস ও নিষ্ঠার মাধ্যমে জীবনের যেকোনো বড় পরিবর্তন শুরু করা যায় আজ থেকেই।
আপনার মতামত লিখুন