৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করলেন শেফালী
ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। বই-খাতার বদলে কাঁধে তুলে নিতে হয় সংসারের দায়িত্ব। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। তিন সন্তানের মা হয়েছেন, সামলেছেন পরিবার। তবে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাননি শেফালী বেগম। স্বামী-সন্তানের উৎসাহ ও সহযোগিতায় ৫২ বছর বয়সে আবারও পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। অবশেষে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার এই নারী। শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফলে জানা যায়, শেফালী গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ থেকে এই ফল অর্জন করেছেন। তার এই সাফল্যে আনন্দিত পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। শেফালী বেগম ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ গ্রামের মকছেদুল ইসলামের স্ত্রী ও বদর উদ্দিনের মেয়ে। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর অর্থাভাবে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে নিজের পড়াশোনা শেষ করার স্বপ্নটি মনের মধ্যে লালন করে গেছেন। একপর্যায়ে স্বামী ও সন্তানদের অনুপ্রেরণায় দীর্ঘ বিরতি শেষে আবারও শিক্ষাজীবনে ফেরেন তিনি। শেফালীর ছেলে আব্দুর রাজ শাফি দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। মেয়ে মাখসূরা খানম নাজমুন রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে গেছেন শেফালী। এলাকায় তিনি একজন রত্নগর্ভা মা হিসেবে পরিচিত। শেফালী বেগম বলেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রী হিসেবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পরীক্ষায় বরাবরই ভালো ফল করেছিলাম। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহ ও সহযোগিতায় নতুন করে পড়াশোনা শুরু করি। আজ জিপিএ-৪.২১ নিয়ে এইচএসসি পাস করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। জীবনের আরেকটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। শেফালীর নাতনি শারাফি রাজ বলে, দাদি এখন আমার অনুপ্রেরণার প্রতীক। আমাদের দেখভালের পাশাপাশি এই বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন। এতে আমি, মা-বাবা সবাই ভীষণ খুশি। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, পরিশ্রমই ভালো ফলের চাবিকাঠি। আমি বড় হয়ে চিকিৎসক হতে চাই। মন দিয়ে পড়াশোনা করলে কোনও স্বপ্নই অসম্ভব নয়। ছেলে আব্দুর রাজ শাফি বলেন, মায়ের এই অর্জন প্রমাণ করে, দৃঢ় সংকল্প, পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতা থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায়ে নতুন করে পথচলা শুরু করা সম্ভব। তার গল্প শুধু আমাদের পরিবারের নয়, সমাজের অসংখ্য মানুষের জন্যও অনুপ্রেরণা। স্বামী মকছেদুল আলম বলেন, শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছে। সংসার সামলে ছেলেমেয়েদের মানুষ করার পর দীর্ঘদিনের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে আমরা আনন্দিত। তার এই সাফল্যে পুরো পরিবার গর্বিত। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতেও কোনো সমস্যা হবে না। গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক আব্দুল মান্নান বলেন, অন্য শিক্ষার্থীদের মতো শেফালীও পড়াশোনায় খুব মনোযোগী। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয় শেফালী বেগমের অর্জন তারই উদাহরণ। ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় মনোবল থাকলে জীবনের যেকোনও বয়সেই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
The post ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করলেন শেফালী appeared first on দৈনিক নীলফামারী বার্তা.





আপনার মতামত লিখুন